দাদনের ফাঁদে ইলিশ


প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৩, ২০২৪, ১:৩৯ অপরাহ্ন / ১৮৪
দাদনের ফাঁদে ইলিশ

বরেণ্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর বিভিন্ন লেখায় ঘুরেফিরে এসেছে বাংলার ইলিশের অতুলনীয় স্বাদ। ‘আড্ডা’ নামের এক প্রবন্ধে তিনি বেহেশতি খাবারের প্রসঙ্গ তুলে ইলিশকে ‘অমৃত’র আসনে বসিয়েছেন। একবার এক পাঞ্জাবি অধ্যাপকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী জোরগলায় বলেন, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার হলো সরু চালের ভাত আর ইলিশ। কিন্তু পাঞ্জাবি সেটা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, বিরিয়ানিই শ্রেষ্ঠ। এই নিয়ে মুজতবা আলী এমন খেপলেন যে ওই অধ্যাপকের সঙ্গে সপ্তাহখানেক আর কথাই বললেন না।

আজ যদি মুজতবা আলী বেঁচে থাকতেন, ইলিশের মহিমা প্রচারের আগে হয়তো এর দাম নিয়ে দশবার ভাবতেন। ভরা মৌসুমেই এখন ইলিশের বাজারে আগুন! সাধারণ মানুষের নাগাল শুধু না, ভাবনারও বাইরে চলে গেছে ইলিশ। কীভাবে হলো এই অবস্থা? ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির সময় রপ্তানি-পাচার বন্ধ থাকায় দেশের মানুষ ইলিশ খেয়েছে তৃপ্তিমতো। ঢাকার ফুটপাতে গড়াগড়ি গেছে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ। দামেও ছিল সস্তা। কিন্তু এখন কেন ইলিশের হাহাকার? দামে আগুন? এটা কি শুধুই ভারতে রপ্তানির অজুহাতে? নাকি আগে থেকেই ঘটে আসা অন্য কোনো ঘটনা?

আরও পড়ুন

ইলিশ আর কত অত্যাচার সইবে

প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়ে ইলিশের অতি মূল্যের বিষয়টা তলিয়ে দেখতে অনুসন্ধানে নামে প্রথম আলো। একে একে বেরিয়ে আসে গভীর হতাশার সব চিত্র। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন; অন্যদিকে বহুদিন ধরে চলে আসছে নদী দখল-দূষণ আর ইলিশ কারবারিদের নেতিবাচক সব তৎপরতা। নিষিদ্ধ মৌসুমে ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা ও নিষিদ্ধ জালে পোনা-জাটকা শিকার চলে সারা বছর। সব মিলিয়ে ইলিশের দেশে এখন লেগেছে আকাল। জেলেদের জালে মিলছে না ইলিশ। যাই বা মেলে, তা নিয়ে শুরু হয় অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কাড়াকাড়ি আর কারসাজি। তাঁদের বহুচর্চিত দাদন চক্র জিম্মি করে রেখেছে বাঙালির সাধের ইলিশকে। এই তো ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির সময় ঢাকার ফুটপাতে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ বিক্রি হতে দেখা গেছে। দামও ছিল তুলনামূলক সস্তা; কিন্তু এখন কেন ইলিশের হাহাকার? দামে আগুন? এটা কি শুধুই ভারতে রপ্তানির অজুহাতে? নাকি আগে থেকেই ঘটে আসা অন্য কোনো ঘটনা?

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এই দাদন চক্রে অন্তত ৫টি ফাঁদের সন্ধান মিলেছে, যেখানে ওত পেতে থাকেন ৫ ধরনের কারবারি। তাঁরা প্রত্যেকেই একই সঙ্গে ইলিশের ক্রেতা ও বিক্রেতা; এবং তাঁদের মধ্যে মাঝখানের তিনজন আবার দাদনের (ঋণের আঞ্চলিক নাম) জালে বাঁধা। যে যাঁকে দাদন দিয়েছেন, তিনি শুধু তাঁর হাতেই ইলিশ তুলে দিতে বাধ্য; বাজার যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই কারও। এই অদ্ভুত বাজরব্যবস্থার মাঝে পড়েই দফায় দফায় দাম চড়ে ইলিশের।

অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আমরা দেখতে পাই, একদল জেলে জীবন বাজি রেখে, ৯ থেকে ১০ দিন সাগরে ভেসে যে মাছ ধরে আনলেন, তা বিক্রি হলো ৬ লাখ টাকায়। পরে দাদন চক্রের মারপ্যাঁচে দেখা গেল, ওই ৫ ধাপের কারবারি প্রত্যেকেই কমবেশি কয়েক হাজার করে টাকা পকেটস্থ করলেন; অথচ মাছশিকারি জেলেরা মাথাপিছু ৫৭১.৪২ টাকার দেনা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন।